Bg Pattern
নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)

নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)

২০২০ সাল শুরু হয় আমেরিকা-ইরানের উত্তেজনা, অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল, ফিলিপাইনে অগ্নুৎপাতের খবর দিয়ে। সাথে চুপি চুপি আরেকটি ভয়াবহতা অপেক্ষা করছিলো। এই ভয়াবহতা হচ্ছে নতুন এক  সংক্রামক রোগ। সংক্রামক রোগ মানবজাতির ইতিহাসে বারবার আক্রমণকারী অপরাজিত শত্রু। নতুন এই সংক্রামক রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী একটি নতুন করোনাভাইরাস। নতুন এই ভাইরাসটির নাম প্রথমে উহান ভাইরাস, পরে নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV) রাখা হয়েছে। পূর্বের সার্স ও মার্স ভাইরাসের ভয়াবহতার অভিজ্ঞতা মনে রেখে ভাইরাসবিশষেজ্ঞ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এই ভাইরাসের উদ্ভব নিয়ে অনেক চিন্তিত এবং সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছেন ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে। বিভিন্ন বিজ্ঞান জার্নাল ও স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্য-উপাত্ত থেকে বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে এই প্রবন্ধটি লিখলাম। লেখার শেষে বাছাই করা ২০টি সূত্র রয়েছে। (সূত্র: ১, ৫, ৬, ৭, ১২)

 

যেভাবে জানা গেল নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV) এর আগমন

প্রতিবছর শীতে মানব ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা ভয়ে ভয়ে থাকে হয় ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়তো করোনাভাইরাসের ছোবল অপেক্ষা করছে। ২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের হোবেই প্রদেশের উহান এলাকাকে থেকে খবর আসে কিছু অজানা কারণে নিউমোনিয়া আক্রান্ত কিছু রোগীর। নিউমোনিয়ার কারণটি ঠিক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ধরতে পারছিলেন না। তাই ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা চীনের সিডিসিকে (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ও প্রিভেনশন- রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র) জানায়। উহানের যে এলাকাতে প্রাদুর্ভাব সেটি সামুদ্রিক মাছ-প্রাণী ও জীবন্ত পশু-পাখি বিক্রয়ের বাজারের কাছাকাছি। সেখানে খোলা-মেলাভাবে পশু-পাখির মাংস বেচা-কেনা হয়। ৩১শে ডিসেম্বরে চীনের সিডিসির একদল গবেষক উহানে যায় পরিস্থিতি বুঝতে ও গবেষণার জন্য তথ্য-উপাত্ত-স্যাম্পল আনতে। বুঝতে বাকি থাকে না যে নতুন এক ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে। তাই গবেষকরা খুব দ্রুত কাজে নেমে যায় ভাইরাসটির পরিচয় জানতে।

অবশেষে ২০২০ সালে ২৪শে জানুয়ারিতে ড. ওয়েনজি টানের গবেষক দল নেয়জেম (নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে) তাদের গবেষণা প্রকাশ করে। গবেষণায় তারা জানায় এটি একটি নতুন করোনাভাইরাস, নাম দেন 2019-nCoV (২০১৯- নোভেল করোনাভাইরাস)। এর আগে এই ভাইরাসটিকে উহান ভাইরাস বলে ডাকা হচ্ছিলো। এখানে বলে রাখা ভালো, এই ভাইরাসের নাম পরে পরিবর্তন হতে পারে (আইসিটিভি ভাইরাসের অফিসিয়াল নাম দিবে)। গবেষণায় জানা যায় এটি করোনাভাইরাসের চারটি গ্রুপের বিটাকরোনাভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত। মানুষকে আক্রান্ত করতে পারা করোনাভাইরাসের বাকি ছয়টি ভাইরাসের সাথে নতুন হিসেবে এই ভাইরাসের আবির্ভাব। (সূত্র: ১, ৬,৭)

তিনজন রোগীর ব্রঙ্কোএলভিউলার লাভাজের তরলে (ফুসফুসের ব্রঙ্কাইয়ের তরল) ভাইরাসে উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষক দল দাবি করেন যে নোভেল করোনাভাইরাস অজানা নিউমোনিয়া রোগের কারণ হতে পারে। কোকস শর্ত পরীক্ষা প্রমাণ করলে অফিসিয়ালি দাবি করা যাবে যে নোভেল করোনাভাইরাসটিই অজানা নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী।

"নোভেল করোনাভাইরাসই যে উহান প্রদেশে অজানা নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী এটা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত হয় নি(আর কিছু প্রমাণ বাকি আছে)। কোন জীবাণু দ্বারা একটি সংক্রামক রোগ ছড়াচ্ছে সেটা প্রমাণের জন্য কোকের শর্তগুলো প্রমাণ করতে হয় । যে জার্নাল নোভেল করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত পেশ করেছে তারা এখনো সেটা প্রমাণ করে নি। (কোকসের শর্ত পরীক্ষা করতে সময় লাগবে।) (সূত্র: ১ ও ১৫)"

 

সংক্ষেপে নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)

নতুন করোনাভাইরাস বিটাকরোনাভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত। বিটাকরোনাভাইরাসে আগে প্রাদুর্ভাব করা সার্স ও মার্স করোনাভাইরাস রয়েছে। নোভেল করোনাভাইরাসটি সিঙ্গেল-স্ট্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস, যার জিনোম ২৯, ৯০৩ বেইসপেয়ার। ভাইরাসটির সিকুয়েন্স ১৭ জানুয়ারিতে এনসিবিআইতে জমা দেয়া হয়। করোনাভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করে কিছু অজানা তথ্য জানা যায় এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দেয়। (সূত্র: ১,১৯)

নতুন করোনাভাইরাস বিটাকরোনাভাইরাসের অন্তর্ভুক্ত।

 

লক্ষণসমূহ:

জ্বর, কাশি, নি:শ্বাসে দূর্বলতা/শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা। ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রচন্ড অসুস্থ বা মৃত্যু হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধ ও শিশুদের।  সিডিসি পূর্বের মার্স করোনাভাইরাসে অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করেছে আক্রান্ত হবার ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিবে। (সূত্র: ১,২,৩, ৫,৬)

 

কিভাবে ছড়ায়:

এই মূহুর্তে এটা নিশ্চিত করা যায় নি ঠিক কোন প্রাণী থেকে মানুষে এসেছে। যেহেতু পূর্বের গবেষণা ও অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন বাদুড় থেকে আসতে পারে। বাদুড় আগে প্রাদুর্ভাব করা সার্স ও মার্সের বাহক ছিলো (বাদুড় অনেক ভাইরাস বহন করে নিজে অসুস্থ না হয়ে)। উহান প্রদেশে অনেক খোলা বাজারে জীবন্ত পশুপাখি বিক্রি হয়। অনেকে ধারণা করছেন জীবন্ত প্রাণী সংস্পর্শে (হাতে ধরা, মাংস/রক্ত/মলের সংস্পর্শ, খাওয়া ইত্যাদি) আসার কারণে হতে পারে। যেহেতু পূর্বে সার্স ভাইরাস বাদুড় ও সিভেট বিড়াল ; মার্স ভাইরাস বাদুড় ও উটের সংস্পর্শে ছড়িয়েছে, তাই অনেকে এই ধারণা করছেন। তবে বিশাল সংখ্যক আক্রান্ত ব্যক্তি খোলা বাজারে যাননি, যেটা বুঝায় ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে খুবই সক্ষম (আরএনএ ভাইরাস খুব দ্রুত বিবর্তিত হতে পারে!)। ১৩ জানুয়ারিতে চীনের বাইরে থাইল্যান্ডে একজন চাইনিজ টুরিস্টেকে আক্রান্ত পাওয়া গেছে যে উহান প্রদেশের বাজারে সাথে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। (সূত্র: ২, ৭,৮,৯,১০,২০)

figure2

চিত্র ৩: করোনাভাইরাসের বাদুড় থেকে অন্তর্বর্তী প্রাণী দিয়ে মানুষে বা অন্তর্বর্তী প্রাণীতে ছড়ানোর চিত্র। উপরের ৬ টি করোনাভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তারমধ্যে সার্স ও মার্স মানুষে প্রাদুর্ভাব করেছে এবং আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যু কারণও ছিলো। সূত্র: ৭।

এখনো পর্যন্ত শুধু চীনে মানুষ থেকে মানুষে সম্ভাব্য ছড়ানোর খবর রয়েছে । অন্য যেসব দেশে আক্রান্ত ব্যক্তি পাওয়া গেছে তাদের কাছ থেকে ছড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি।

 

ভাইরাসটি কি বাদুড় বা সাপ থেকে কি এসেছে?

করোনাভাইরাস মানুষ ছাড়াও অন্যান্য স্তন্যপায়ী (যেমন বাঁদুড়, বিড়াল, শুকর, কুকুর, গবাদি পশু, উঠ, খরগোশ), পাখি ও সাপকে সংক্রমণ করে বলে দাবি করা হয়। (সাপের ব্যাপারটা পুরোপুরি নিশ্চিত নই।) বাদুড় করোনাভাইরাসসহ বহু ভাইরাসের বাহক হিসেবে পরিচিত ও বাদুড় থেকে মানুষে বহু ভাইরাসের সংক্রমণের ইতিহাস রয়েছে (যেমন বাংলাদেশে খেজুর রসের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের মৌসুমী প্রাদুর্ভাব), সেই অনুযায়ী কিছু গবেষক ধারণা করেন নতুন এই করোনাভাইরাসটি বাদুড় থেকে আসতে পারে ধারণা করেন। অন্যদিকে একদল গবেষক নতুন এই করোনা ভাইরাসের সাথে অন্য করোনাভাইরাসে জিনোমের বিবর্তনগত বিশ্লেষণ করেন। বিবর্তনগত বিশ্লেষণ ধারণা দেয়ে একটি ভাইরাস কোন প্রজাতি থেকে এসেছে বা অন্য কোন ভাইরাসের সাথে মিল। নতুন এই করোনাভাইরাসটি বাদুড়ের সার্স করোনাভাইরাসের সাথে ৮৫% মিল রয়েছে। অন্য দিকে তারা  দাবি করেন নতুন করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন (অন্যতম একটি প্রোটিন যা ভাইরাসকে কোষ আক্রমণে সহায়তা করে) এ হোমোলোগাস রিকম্বিনেশন হয়েছে করোনাভাইরাসের আরেকটি শ্রেণী/ক্লাড থেকে। পরবর্তীতে তারা ভাইরাসের কোডন ব্যবহার অন্য প্রাণীর সাথে তুলনা করতে গিয়ে সাপের সাথে মিল পান। সেটা থেকে গবেষকরা ধারণা করেন, হয়তো সাপ থেকে মানুষে ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়েছে। উহানের ঐ বাজারে সাপও বিক্রি হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। (সূত্র :১,২,৩,৪,২০)

চিত্র ৪: নতুন করোনাভাইরাসে বিবর্তনগত বিশ্লেষণে কোডন ব্যবহার অন্য প্রাণীর সাথে তুলনা করতে গিয়ে সাপের দুটি প্রজাতির সাথে মিল পান ড. জিংগুয়াং লি এর গবেষক দল। গবেষণাতে ছাপা ছবিটির শুধু উপরের অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। সূত্র: ৪।

এখানে বলে রাখা ভালো, সাপ থেকে ভাইরাসটি আসা সম্ভাব্য অনুমান. তারা সাপে ভাইরাসে উপস্থিতি দেখাননি বা দেখানোর চেষ্টাও করেননি। ল্যাবে প্রমাণিত করার চেষ্টা ঐ গবেষকরা করেননি। গবেষকদল বিবর্তরগত বিশ্লেষণ ও প্রাদুর্ভাবের তথ্যের সাথে মিল খুঁজে উক্ত সম্ভাব্য সংক্রমণের ধারণা দেন। সাপ থেকে ভাইরাসটি কিভাবে আসবে সেটা নিয়েও কিছু গবেষক সন্দিহান! যেহেতু সাপ হচ্ছে সরিসৃপ ও শীতল রক্ত বিশিষ্ট, তাদের ভাইরাস তাপমাত্রার দিকে সংবেদনশীল আর এদিকে মানুষ হচ্ছে স্তন্যপায়ী ও উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট, নতুন করোনাভাইরাস সাপ থেকে এসে এতো দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারার কথা নয় (যদি আরএনএ ভাইরাসের মিউটেশন ও এভ্যুলুশন অনেক বেশি)। সব মিলিয়ে কোন প্রাণী থেকে এসেছে ও কোন প্রাণীতে ভাইরাসটি প্রকৃতিতে সাধারণত থাকে সেটা নিয়ে এখনো কোন গবেষণা হয়নি।

 

সাপ খেয়ে কি নোভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে কি?

সাপ খাওয়া থেকে আক্রান্ত হবার নিশ্চিত কোন ঘটনা বিজ্ঞান জার্নাল বা স্বাস্থ্যসংস্থা থেকে জানা নাই (করোনাভাইরাসের কোডন ব্যবহার তুলনা করে সাপের সাথে মিল পেয়েছে)।(সূত্র:৪) যেসব অনলাইন নিউজ পোর্টাল এইখবরটি প্রচার করছে তারা সম্ভবত সূত্র ৩ এর অনুমানকে ‘তিলকে তাল বানিয়েছে’। কোন বিজ্ঞান জার্নাল এখনো এটা নিশ্চিত করেনি পরীক্ষা করে এটি সম্ভব।  ভাইরাস নিয়ে গত ৬ বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যথেষ্ট প্রমাণ নেই এবং ঐ জার্নালও দাবি করেনি যে সাপ খাওয়া থেকে ছড়িয়েছে। আমি এটা দাবি করছি না যে অসম্ভব। যেহেতু কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সাপ খাওয়া থেকে ভাইরাস এসেছে সেটার নিশ্চয়তা পাইনি এই লেখা পর্যন্ত। তাই ঐ খবরগুলোকে গুজব বলেই মনে করছি আপাতত।  এই লিখা পর্যন্ত কোন বিজ্ঞান জার্নাল সাপ খাওয়া থেকে ভা্‌ইরাসটি ছড়িয়েছে জানায়নি।

 

কোথায় ছড়িয়েছে, কতজন আক্রান্ত ও কতজন মারা গিয়েছে?

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২০ বিশ্ব সাস্থ্যসংস্থার সিচুয়েশন রিপোর্ট ৭ (২৮ জানুয়ারি, ২০২০) এর হিসেব অনুযায়ী সর্বমোট ২৭৯৮ জন আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে ২৭৪১ জন চিন দেশের (প্রায় ৬০০০ এর কাছাকাছি সম্ভবত আক্রান্ত)। একই রিপোর্টে ৮০ জন মারা গিয়েছে দাবি করা হয় ।

তবে জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সিভিল ও সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অনলাইন জিওলজিকাল ম্যাপে সর্বমোট ৪৪৭৪ জন আক্রান্ত ও ১০৭ জনের মৃত্যু খবর দেয়া হয়। চিনের বাইরে যে দেশগুলোতে ছড়িয়েছে সেগুলো হচ্ছে হংকং, মাকাও, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, মালয়শিয়া, নেপাল, ক্যাম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কোরিয়া (দক্ষিণ), কানাডা, আইভরি কোস্ট, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্র। (সূত্র ৯, ১০, ১১)

চিত্র ৫: পৃথিবী ব্যাপী নতুন করোনাভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব। সূত্র :১১।

হিসাবে একটু ভিন্ন হবার কারণ হচ্ছে সিডিসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের হিসেবে চিকিৎসক ও নিশ্চিত আক্রান্তের হিসেব নেয় যেটা আপডেট বা হালনাগাদ হয় প্রতিদিন। জন হপকিন্সের ক্ষেত্রে রিপোর্ট প্রতি মিনিটেই হালনাগাদ হচ্ছে।

 

প্রতিষেধক ও টিকা

এখনো কোন প্রতিষেধক (এন্টিভাইরাল) বা টিকা নেই এই ভাইরাসের জন্য। জরুরী অবস্থায় ডাক্তারদের আক্রান্ত ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে বাঁচানোর জন্য পথ্য বা চিকিৎসা দিবার নির্দেশনা দেয়া আছে। এই লেখা পর্যন্ত কোন বিজ্ঞান জার্নাল দাবি করেনি তাদের কাছে সফল ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা রয়েছে। প্রতিষেধক তৈরির জন্য অনেক দেশই কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে কোন দেশই এখনো সফল ভ্যাকসিন তৈরি করেছে বলে কোন বিজ্ঞান জার্নাল বা নির্ভরযোগ্য সূত্র বলে নাই।

 

কী করা উচিত (সিডিসির উপদেশ)

১. শীতকাল ফ্লু সহ অন্যান্য ঠাণ্ডার (ফুসফুসকে আক্রান্তকারী) ভাইরাসের পৌষমাস! এইসব ভাইরাস ঠাণ্ডাতে খুব সহজে ছড়ায়। তাই ফ্লু এর টিকা নেয়া উচিত।

২. যারা ভ্রমণ করছেন তারা মাস্ক পরিধান করতে পারেন (এন্টিভাইরাল মাস্ক)। এন্টিভাইরাল মাস্কের বাইরের অংশ (সাধারণত নীল) বাইরে থেকে কোন তরল ঢুকতে দেয় না। আর ভিতরের অংশ (সাধারণত সাদা- শোষণের জন্য প্যাড থাকে) যেটি তরল শুষে নিবার ক্ষমতা থাকে। এই ধরণের মাস্ক সাধারণত বাইরের মানুষের হাঁচি-কাঁশির থেকে সুরক্ষা দেয় সাথে আপনার থেকে ভাইরাস ছড়ানোকেও প্রতিরোধ করে।

৩.চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অবশ্যই সচেতন থাকবেন। যেকোন সংক্রামক রোগের কোলেটারাল মৃত্যুর শিকার হোন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা (স্যালুট তাদের!)। রোগীদের দিকে লক্ষ্য রাখুন, নিজে মাস্ক, গ্লাভস, এপ্রন ব্যবহার করুন (এপ্রন কর্মস্থলেই রাখুন- বাসায় নিয়ে আসলে বাসার লোকজনকে আক্রান্ত করার সুযোগ থাকে)।

৪. আপনার হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট বা কাশি শুরু হয়, ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকুন যদি অসুস্থ হোন বা কাউকে অসুস্থ দেখেন।

৫. হাত সাবান ও পানি দিয়ে কমপক্ষে বিশ সেকেন্ড ধোবেন। সাবান না থাকলে এলকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

৬. হাত না ধুয়ে মুখ, নাক, চোখ ধরা থেকে বিরত থাকুন। যেসব বস্তু বারবার বহু মানুষের স্পর্শ পায় (যেমন দরজার হ্যান্ডল) সেগুলো জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার করুন (সূত্র: ৮)।

 

কেন বার বার করোনাভাইরাস হানা দিচ্ছে চীন বা অন্য দেশগুলোতে?

করোনাভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হচ্ছে বাদুর এবং বাদুর থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়ায়। মানুষ যখন সেসব প্রাণীর সংস্পর্শে(স্পর্শ, মল-মূত্র, খোলা মাংস) আসে তখন সেটা মানুষে ছড়ায়। অপরিষ্কার খোলা বাজারে পশু-পাখি বিক্রয় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই ঝুঁকি। কসাইখানার পরিবেশ যদি জীবাণুমুক্ত বা পরিষ্কার না হলে সহজেই বিভিন্ন জীবাণু ছড়ানোর সুযোগ থাকে। চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খোলাবাজারে প্রক্রিয়াহীন মাংস বিক্রয় হয়। অনেকক্ষেত্রে জীবন্ত প্রাণী (পশু-পাখি) কিনতে চায় ক্রেতা (যাতে বিক্রেতা মৃত বা ভেজাল মাংস না দিতে পারে)। যেকারণে ভাইরাস সক্রিয় থাকা অবস্থায় ক্রেতা-বিক্রেতা ও বাজারে আসা লোকজনে ছড়ানোর সুযোগ থাকে। সেই সাথে সেইসব দেশে জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি থাকায় একজন থেকে আরেকজনে ছড়ানো সুযোগ থাকে। আর এতো মানুষের মধ্যে কিছু লোক থাকবে যাদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল (যেমন বৃদ্ধ, শিশু ও অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি)। দুর্বল রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার লোকদের আক্রান্ত করে ভাইরাস মিউটেশন করে বিবর্তিত হয়ে আরো ভয়ানক হয় ও বেশি ছড়ানোর বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। একই সাথে মানুষের অসেচতনা, ডাক্তারদের কাছে না যাওয়া ও অবহেলা এইরকম ভাইরাস ছড়ানোতে সাহায্য করে। নিচের মিম চিত্রে কৌতুক করে সহজে বুঝানো হয়েছে কিভাবে অপরিষ্কার বাজারে খোলা অবস্থায় পশু-পাখি বিক্রয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন ভাইরাস মানুষে প্রাদুর্ভাব করে।

চিত্র ৬: ছোট্ট এই মিমে করোনাভাইরাসের বারবার সংক্রমণে কারণস্বরুপ খোলাবাজারের অপরিচ্ছন্নতা ও অসচেতনা দেখানো হয়েছে।


কেমন আছে উহান প্রদেশ?

খুব বেশি খবরাখবর পাওয়া এ মূহুর্তে সম্ভব নয় যেহেতু এলাকাকে কোয়ারেন্টাইন ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে লেভেল ৩ নির্দেশ দেয়া আছে। আটকে পড়া বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে জানা যায়, উহান খুব শুনশান হয়ে গেছে। সবাইকে ঘরে থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়ে। উহানের সাথে বাকিসব এলাকার যোগাযোগ বন্ধ করা হয়েছে যাকে বলে লকডাউন। চীনের নববর্ষের (লুনার ইয়ার) জন্য সরকার ও গবেষকরা ভয়ে আছেন। বড় ধরনের লোক সমাগমে যে কোন রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। যদিও সরকার ও ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীরা উপদেশ দিয়েছেন লোক সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে কতটা কার্যকর হবে সেটা চিন্তনীয়। উহান প্রদেশের ঐ এলাকা স্থবির। আশাকরি এই প্রাদুর্ভাব যেন খুব দ্রুত চলে যায় (সূত্র ১৪)।

Related Posts

মুহাম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী (শামীম): লজিং মাস্টার থেকে তুখোড় বিজ্ঞানী
নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)
কি হবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়?

For post a new comment, you need to login first.

Comment (0)

    No comment yet, Be the first :)

About Author
Swajib Hassan

Swajib Hassan

Since: 2019-11-28

অনেক ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিলো, হয়তো সেই আকর্ষণ থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে পেরেছি এবং এখনো করে যাচ্ছি। আর এই আগ্রহ থেকেই সবসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে আপডেট থাকার চেষ্টা করেছি। জীবনে টেকনোলজি আমাকে যতটা ইম্প্রেস করেছে ততোটা অন্যকিছু কখনো করতে পারেনি। আর এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকেই লেখালেখির শুরু.....

Popular Posts
SAR ভ্যালু: সার ভ্যালু নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা! সেলফোন রেডিয়েশন
SAR ভ্যালু: সার ভ্যালু নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা! সে...

Dec 12, 2019

মানুষের বিবর্তন হচ্ছে? ——– জ্বি, হচ্ছে
মানুষের বিবর্তন হচ্ছে? ——– জ্বি, হচ্ছে

Dec 12, 2019

মাল্টিভার্সঃ অন্য এক মহাজগৎ
মাল্টিভার্সঃ অন্য এক মহাজগৎ

Nov 27, 2019

ব্ল্যাক ফ্রাইডে আসলে কি জিনিস? এটা বলতে কি বোঝানো হয়?
ব্ল্যাক ফ্রাইডে আসলে কি জিনিস? এটা বলতে কি বোঝানো...

Nov 28, 2019

কি হবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়?
কি হবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়?

Jan 26, 2020

Ad Booking Available

Buy Book Online Now!

Buy Now
Latest Posts
নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)
নোভেল করোনাভাইরাস (2019-nCoV)

Feb 1, 2020

অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সিরিজ : ৫ টি বেস্ট অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ
অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সিরিজ : ৫ টি বেস্ট অ্যান্ড্রয়েড...

Jan 31, 2020

কি হবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়?
কি হবে যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়?

Jan 26, 2020

মানুষের বিবর্তন হচ্ছে? ——– জ্বি, হচ্ছে
মানুষের বিবর্তন হচ্ছে? ——– জ্বি, হচ্ছে

Dec 12, 2019

SAR ভ্যালু: সার ভ্যালু নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা! সেলফোন রেডিয়েশন
SAR ভ্যালু: সার ভ্যালু নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা! সে...

Dec 12, 2019